Categories
Life Story

হুমায়ূন আহমেদের মোটিভেশন

মোটিভেশন বা উদ্যম নিয়ে বাজারে অনেক বইপত্র পাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে মোটিভেশনের ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। বইগুলো কাজের। অনেক সেল হয়। প্রচুর রিয়েল লাইফ স্টোরি থাকে ওগুলোতে। পড়ে মানুষ উদ্যম ফিরে পায়। মাইন্ড সেট এবং গোল এইচিভে অনেককেই হয়তো বইগুলো হ্যাল্প করে।

বাট বেশির ভাগ মোটিভেশনই ফেলই করে। কেন ফেল করে? এই প্রসঙ্গে আসার আগে আসুন মটিভেশন নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটা লাইফ স্টোরি আগে জানা যাক।

০১
হুমায়ূন আহমেদ ক্লাস থ্রী থেকে ফোরে উঠবেন। বার্ষিক পরিক্ষা চলে এসেছে। উনাদের বাসায়, ভাইবোনদের মাঝে পড়াশুনার ধুম প্রতিযোগিতা চলছে। কিন্তু উনি নির্বিকার। উনার পড়তে ভালো লাগে না। বই নিয়ে বসতে ভালো লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেটা পুরোপুরিই ভান। সবাইকে দেখানো তিনি বই নিয়ে বসে আছেন, পড়ছেন।

তখন উনারা সিলেট শহরে থাকেন। প্রতি সন্ধায় ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে “লন্ঠন লেকচার” বলে বিশেষ এক ধরনের সচেতনাতা মূলক শো দেখানো হয়। ওনাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক খোঁজ নিয়ে আসতো আজ কোথায় “লন্ঠন লেকচার” হবে। এবং দুজনে মিলে হাওয়া হয়ে যেতেন।

বহু চেষ্টা করেও ওনার ঘাড় থেকে এই ভুত নামানো গেলো না। ওনার মা হাল ছেড়ে দিলেন।

এই রকম যখন চলছিলো তখন একদিন মাথামোটা শংকর খুব উত্তেজিত হয়ে খবর নিয়ে এলো। সে যদি ক্লাস থ্রী থেকে ফোরে পাস করে উঠতে পারে তবে তার মা তাকে একটা ফুটবল কিনে দেবে। সে এসেছে সাহয্যের আশায়, তাকে যেন এক ধাক্কায় ক্লাস ফোর উঠার কোন উপায় বের করা হয়।

একটা চামড়ার ফুটবলের খুব শখ ছিলো তাদের। পরম উৎসাহে হুমায়ূন আহমেদ সংকরকে পড়াতে শুরু করলেন। যে কোরেই হোক ওকে পাস করাতে হবে।

দুজনে একই ক্লাসে পড়েন। এখন হুমায়ূন হয়ে গেলেন শিক্ষক আর শংকর তার ছাত্র। তো শংকরকে পড়াতে গিয়ে আগে হুমায়ূন আহমেদ কে পড়তে হলো, বুঝতে হলো। এদিকে যতই বোঝান শংকরের মাথায় কিছুই ঢোকে না। যাই হোক, প্রাণপণ পরিশ্রম করে ছাত্র-শিক্ষক দুজনে প্রস্তুতি নিলেন। পরীক্ষা দিলেন। ফল বের হলে দেখা গেলো উনার ছাত্র শংকর ফেল করেছে আর উনি স্কুলের সকল শিক্ষকদের স্তম্ভিত করে দিয়ে প্রথম হয়ে গেছেন! ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বাসায় ফিরলেন…

০২
দেখুন, শংকরের মা শংকরকে মোটিভেট করার জন্য ফুটবল অফার করেছিলো। শংকর, হয়তো মোটিভেট হয়েছে, হুমায়ূন আহমদের কাছে হয়তো নিষ্ঠার সাথে পড়াশুনাও করেছে কিছু সময়। কিন্তু যে গোল সেট করা ছিলো তার সামনে, ক্লাস থ্রী থেকে ফোরে পাস করে উঠা, সেটা পারে নাই। হুমায়ূন ঠিকই পেরেছেন। ব্যাপারটা ইন্টেরেস্টিং! তাই না? আর ঠিক এই ইন্টেরেস্টিং জায়গাটাতেই বেশির ভাগ মোটিভেশনাল তন্ত্রমন্ত্র ফেল করে।

ব্যাক্তি মানুষের ধারণ এবং ক্যাপাবিলিটি অনুযায়ী গোল সেট করতে না পারা এই রকম ভাবে ফেইল হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ কারন। যে মোটিভেট হতে চায়, নিজেকে ইভ্যালুয়েট করতে চায়, তাকে প্রথমত নিজের ক্যাপাবিলিটি বুঝতে হয় এবং সেই ক্যাপাবিলিটি অনুযায়ী গোল সেট করতে হয়। এবং সেই গোল অর্জনের জন্য স্টেপ বাই স্টেপ ছোট ছোট গোল কমপ্লিট করতে হয়।

সাকিব আল হাসানের কথাই চিন্তা করেন। বিশ্ব সেরা অল-রাউন্ডার। সে এই লক্ষ্যে কি ভাবে পৌছুলো? কন্টিনিউয়াসলি প্র্যাকটিস করে ছোট ছোট গোল অর্জন করতে করতে। নেট সেশনে একদিন হয়তো শুধু কভার ড্রাইভ প্র্যাকটিস করেছে। অন্য একদিন কেবল মাত্র পুল এবং পুল। অন্য একদিন হয়তো ঘন্টার পর ঘন্টা লং ড্রাইভ। এই ভাবে একটি একটি করে সিগমেন্টে নিজেকে দক্ষ করে তুলেছ এবং ফাইনাল্লি সবগুলোকে কম্বাইন্ড করেছে।

কোন কিছু অর্জন করার জন্য কেবল মাত্র মটিভেশনই যথেষ্ট নয়। মোটিভেট কেন হবেন? তার জন্য গোল সেট করতে হবে। গোল সেট এমন ভাবে করলে হবে না যা আপনার বর্তমান কন্ডিশনের সাথে অবাস্তব। এবং গোলটাকে এচিভ করতে ছোট ছোট ফ্রেকশনে ভাঙ্গতে হবে, প্রত্যেকটা ছোট ছোট ফ্রেকশনের জন্য মোটিভেট হতে হবে। দেন পুরোটাকে কম্বাইন্ড করতে হবে।

প্রপারলি কি ভাবে নিজেকে মোটিভেট হতে হবে, সেটাও শেখার বিষয়। আসলে শেখার কোন বিকল্প নেই!

রেফারেন্সঃ মাথামোটা শংকর এবং গ্রীন বয়েজ ফুটবল ক্লাব; পৃষ্ঠা ৩৮, “আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই – হুমায়ূন আহমেদ। কাকলী প্রকাশনী।

Categories
Book Review

স্টিফেন কিং-এর “দি আউটসাইডার”

“… জায়গাটার ঠিক মাঝখানে ছিলো গ্রানাইটের একটা বেঞ্চ, রক্তে একেবারে মাখামাখি হয়ে ছিলো ওটা। এত রক্ত যে কী বলবো… বেঞ্চের নিচটাও মাফ পায়নি। লাশ পরে ছিলো ওটার পাশেই, ঘাসের ওপরে। বেচারা… মাথা আমার দিকেই ঘোরানো ছিলো, চোখ খোলা; আর গলা… উধাও। ওখানে লাল একটা গর্ত ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিলো না। নীল জিন্স আর আন্ডারপ্যান্ট টেনে নামিয়ে রাখা হয়েছিলো গোড়ালি পর্যন্ত। দেখতে পেলাম যে একটা…মরা ডাল হবে…” 

ক্রাইম ফিকশন এবং হরর-লাভার পাঠক, আপনাদেরকে স্বাগতম ২০১৮ সালে প্রকাশিত স্টিফেন কিং-এর ক্রাইম-হরর উপন্যাস “দি আউটসাইডারে”র বাংলা অনুবাদে; আর গল্পটা ঠিক এরকম ভাবেই শুরু হয়েছে। ধর্ষনের পর এমন বিভৎস আর নিষ্ঠুর ভাবে খুন করা হয় ১১ বছরের বালক ফ্র্যাংক পিটারসনকে। 

এমন নৃশংস্য ভাবে কে খুন করলো ছেলেটাকে? কে খুনি? টেরি ম্যাটল্যান্ড! ফ্লিন্ট সিটি “লিটল লিগে”র পপুলার বেসবল কোচ। তার কৃতকর্মের সাক্ষি ৬ জন আইইউটনেস।

একজন টেরিকে দেখেছে বাচ্চাটাকে ভ্যানে তুলতে; একজন দেখেছে যেখানে বাচ্চাটাকে খুন করা হয়, সেই ক্রাইমসিনের কাছাকাছি এরিয়ার পার্কিংলটে রক্ত মাখামাখি অবস্থায় ভ্যানে উঠতে; ওই রকম অবস্থায় আর একজন প্রত্যক্ষদর্শীকে টেরি জিগ্গেস করে আশাপাশে কোথায় গেলে কুইককেয়ার বা ফার্স্টএইডের মত সার্ভিস পাওয়া যাবে; পরে রক্তটক্ত ধুয়ে ফ্রেশ হতে পাবে গেলে সেই পাবের এক বাউন্সারের সাথে তার কথা হয় এবং সেখান থেকে বের হয়ে যে রেডইন্ডিয়ান মহিলার ক্যাবে করে টেরি রেলস্টেশনে যায়, সেই মহিলা!

এরা সবাই টেরিকে চেনে বহু বছর ধরে। এতগুলো সাক্ষির ভুল হওয়ার কোন কারণ নেই।

আর এর সাথে প্রমান হিসেবে আছে, ক্রাইম স্পটে পাওয়া আঙুলের ছাপ, বাচ্চাটাকে কিডন্যাপে যে ভ্যান টেরি ব্যবহার করেছিলো সেই ভ্যানে পাওয়া আরো অসংখ্য আঙুলের ছাপ; আর সেগুলো টেরির আঙুলের ছাপের সাথে পজেটিভলি ম্যাচ করেছে। ইভেন ব্লাড স্যাম্পলেরও পজেটিভ ম্যাচ।

এরপর আর ডিটেকটিভ এ্যান্ডারসনের টেরিকে ম্যাচ চলাকালিন স্টেডিয়াম ভর্তি ১৫শ লোকের সামনে এ্যারেস্ট করতে দ্বিধা থাকার কোন কারণই নেই। ঘটেও তাই। টেরিকে জনসমক্ষে ফ্যাংক পিটারসনকে ধর্ষণ এবং খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়।

পুরো একটা স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষের সামনে টেরিকে গ্রেফতারের দৃশ্যটা কিং দারুন মুন্সিয়ানার সাথে বর্ননা দিয়েছেন।

যখন অফিসার র‍্যামেজ উচু কন্ঠে, যেন উপস্থিত সকলেই পরিস্কার শুনতে পায়, “টেরেন্স মেটল্যান্ড, তোমাকে আমি ফ্র্যাংক পিটারসনকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করছি” বলে ঘোষণা দেয়, দর্শকরা বিস্ময়ে চেচিয়ে উঠে। হতবাক টেরির মুখ দিয়ে যখন, “মানে কী? ঠাট্টা করছ?” এই দুটো কথা বের হয়ে আসে, ঠিক সেই মুহূর্তে “ফ্লিন্ট সিটি কল” পত্রিকার স্পোর্টস ফটোগ্রাফার টেরির ছবি তোলে। পরের দিন যেটা পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়। সেই ছবিতে দেখা যায় মুখ হা করে আছে টেরি, চোখদুটো বিস্ফোরিত; যেমন হতভম্ভ দেখাচ্ছিলো ওকে, তেমনি মনে হচ্ছিলো…. দোষী… শিশু ধর্ষক… খুনি একটা….!

যখন অফিসার টম ইয়েটস ওকে জোর করে হাত সামনে এনে হাতকড়া পরিয়ে আগের মতই উচ্চকন্ঠে, “চুপ থাকার এবং আমাদের প্রশ্নের জবাব না দেয়ার অধিকার তোমার আছে…..” বলে ঘোষণা শেষ করে, ততক্ষণে স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শকরা দিশেহারা…. টেরির স্ত্রী মার্সি ঘোরগ্রস্থের মত চলে এসেছে দর্শক আর মাঠের মাঝের বেড়ার কাছে, ঘটনার বিমূঢ়তায় কখন যে ঝাঁকাতে শুরু করেছে বেড়াটাকে নিজেও জানে না। আর টেরির দুই মেয়ে… সারা এবং গ্রেস হাটু গেড়ে মাটিতে বসে ভেঙ্গে পরেছে কান্নায়!

পাঠক, পুরো দৃশ্যটা যদি ভিজুয়ালাইজ করতে পারেন, যদি আপনি টেরি ম্যাটল্যান্ডের জায়গা থেকে দৃশ্যটাকে উপলব্ধি করতে পারেন… তবে বুঝতে পারবেন… কি কেয়ামত নেমে এসেছিলো টেরি মেটল্যান্ডের জীবনে!

ঠিক ওই মোমেন্টে টেরিকে ঘিরে ধরে একই সাথে ক্রোধ এবং হতাশার তীব্র অনুভূতি। জনসমক্ষে অপমান করার হয়েছে ওকে, এই ভেবে ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পরছে সে। যত তারাতারি সম্ভব ব্যাপারটাকে চুকিয়ে ফেলে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করার কথা ভাবে সে; আবার এটাও বুঝতে পারে, এই একটা মুহূর্তে, লম্বা সময়ের জন্য, তছনছ হয়ে গেল ওর জীবন।

আসলেই তছনছ হয়ে যায় টেরির জীবন। আদালতে নেয়ার পথে গুলি করা হয় ওকে… গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মারা যেতে যেতে… ডিটেকটিভ এ্যান্ডারসনের মুখোমুখি হয় টেরি। টেরি, ডিটেকটিভ বলে ওকে, তুমি মারা যাচ্ছো। বুঝতে পারলে? মরার আগে স্বীকারোক্তি দিয়ে যেতে হবে তোমাকে। বলো ফ্র্যাংক পিটারসনকে তুমিই হত্যা করেছো। পরিস্কার বিবেক নিয়ে কবরে যাও।

জবাবে টেরি হাসে, ততক্ষণে রক্তের ধারা বেরিয়ে এসেছে ঠোটের দুই কোন দিয়ে। “করিনি” বলে সে, কন্ঠ নিচু, তবে ফিসফিস করে বললেও পরিস্কার শোনা যায়, “আমি খুন করিনি। রাফল… তোমার বিবেক এখন পরিস্কার করবে কি ভাবে?” মৃত্যুর আগে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় সে।

ফলে টেরির নয়, বরং ডিটেকটিভ রালফ এ্যান্ডারসনকেই বিবেক পরিস্কার করার জন্য ব্যাক্তিগত উদ্যোগে তদন্তে নামতে হয়। কারণ টেরির ছিলো স্ট্রং এ্যালিবাই।

যেদিন ফ্র্যাংক খুন হয় সেদিন টেরি শহরেই ছিলো না। একটা লিটারেরি কনফারেন্সে যোগ দিতে আরো তিনজন কলিগসহ সে গিয়েছিলো পাশের ক্যাপ সিটিতে। এমন কি সেই কনফারেন্স কভার করতে আসা টিভি রিপোর্টের ভিডিও ফুটেজেও তাকে দেখা যায় লেখন হারলেন কোবকে প্রশ্ন করতে! তার আঙুলের ছাপ পাওয়া যায় সেই কনফারেন্স রুমের পাশে অবস্থিত বইয়ের দোকানের একটি বইয়ের কভারে, যে বইটা সে হাতে নিয়ে দেখেছিলো, দাম বেশি বলে না কিনে আবার সেলফে ফিরিয়ে রাখে।

তাহলে? একই লোকের পক্ষে দুই জায়গাতে কি ভাবে থাকা সম্ভব!
বিবেক পরিস্কার করতে হলে ডিটেকটিভ এ্যান্ডারসনকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে হবে। সমাধাণ করতে হবে লজিক দিয়ে যে পদ্ধতিতে আমরা সাধারণত একটা ঘটনাকে ব্যাখ্যা করি, বিচার-বিশ্লেষণ করি, তার বাইরে গিয়ে। সেই পথটাই এ্যান্ডারসনকে দেখায়, এই উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট হলি গিবনি। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং প্রোপার রিসার্চ করে গিবনি দেখায় যে একজন মানুষের পক্ষে একই সময়ে আসলেই দুই জায়গাতে থাকা সম্ভব নয়। আর যখন বাচ্চাটা খুন হয় তখন টেরি সত্যি সত্যিই কনফারেন্সে ছিলো। তাহলে খুনটা করলো কে?

খুনটা করেছে একজন “আউটসাইডার” – উত্তরটাও গিবনি দেয়।

কে এই আউটসাইডার? কেন সে খুন করে? কি ভাবে করে?

পাঠক, আপনার যদি সত্যি জানার আগ্রহ থাকে, তবে আপনাকে ডুব দিতে হবে স্টিফেন কিং-এর ২০১৮’র উপন্যাস “দি আউটসাইডারে”র জগতে।

পাঠ অনুভূতি এবং মন্তব্যঃ

উপন্যাসটা কেমন লেগেছে সেটা বলার আগে কিং-এর একটা উদৃতি দেই, “একটা নভেল যদি ‘এন্টারটেইনমেন্ট’ না হয় আমার মনে হয় না বইটা সফল হইছে।” কিং-এর এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে যদি কিং-এর কথাকে আমলে নেই, তবে বলবো রিডিং “দি আউসাইডার” এন্টারটেইনিং ছিলো।

দিন, তারিখ এবং সময় ধরে শুরু থেকে টেরিকে গ্রেফতারের প্রস্তুতি, গ্রেফতার, পুলিশের গাড়িতে করে থানায় নিয়ে আসা, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনা পরিক্রমার সাথ সাথে আইউইটনেসদের জবানবন্দি, ফারেনসিক রিপোর্ট, মেডিকেল এক্সামিনাদের বক্তব্য, ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এগুলো একটার পর একটা বিন্যাস্ত করে কিং যে স্টাইলে ঘটনাটাকে এগিয়ে নিয়েছেন এইটা চমৎকার ছিলো।

এরপর ক্রাইম স্টোরি থেকে যে ভাবে হলি গিবনির তদন্তে ঘটনাটা হরর মিথলোজির দিকে টার্ন করেছে সেটাও ইন্টেরেস্টিং।

সর্বপোরি কিং এই উপন্যাসে একটা হরর গল্প বলার পাশাপাশি ক্যারেক্টার ডিটেইলিং এ যেভাবে মনোযোগ দিয়েছেন, ডিটেইল পড়তে পছন্দ করে এমন পাঠক সেটা নিঃসন্দেহে পছন্দ করবে। এগুলোর ভেতর দিয়ে ক্যারেক্টারদের ভিজুয়ালটা ক্লিয়ার হয়ে উঠেছে এবং পাঠক হিসেবে গল্পের ভেতরে ঢুকতে সুবিধা হয়েছে। এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্যারেকটারদের ছোট ছোট মন্তব্য বা উপলব্ধি; এবং কোন ঘটনা বা অনুভূতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্যারেকটারদের যে সকল ব্যাকস্টোরির অবতরনা লেখক করেছেন, এগুলো বেশ ভালো ছিলো।

ফুয়াদ ভাইয়ের অনুবাদ নিয়ে কেবল একটা কথা বলবো। আপনি কেবল অনুবাদক নন, আপনি লেখকও। সুতরাং অনুবাদের ক্ষেত্রে গল্প এবং মূল লেখকের ভাষা শৈলির উপরে নজর রেখে আমি চাই আপনি আরো স্বাধিনতা নেন। আমি চাই আপনার অনুবাদ এমন হোক, যেন পড়তে গিয়ে আপনার নাম ভুলে যাই! 😀 (এই বই পড়েতে গিয়ে অবস্য আপনার নাম তেমন মনেই পড়ে নাই) যেন মনে হয় আপনার অনুবাদ না, মূল লেখকরেই পড়ছি। 

অনুবাদকের প্রতি সুভেচ্ছা। পাঠক হিসেবে এমন আরো আরো অনুবাদ চাই।

“দি আউটসাইডারে”র প্রোডাকশন কোয়ালিটি খুবই ভালো হয়েছে। প্রচ্ছদ, বাধাই, বুক ডিজাইন, ফন্ট সাইজ, মার্জিনে ছাড় দেয়া; সবই দারুন। বই প্রকাশের আগে একদিন প্রকাশকের সাথে আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়েছিলো, তখন প্রস্তাব করেছিলাম বইটাতে ৮/১০টা ইলাস্ট্রেশন এ্যাড করা যায় কি না; প্রকাশক রাজীও হয়েছিলেন, কিন্তু ইলাস্ট্রেটরের ব্যাক্তিগত সমস্যা এবং প্রকাশক নিজেই অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ার কারণে ফাইনাল প্রোডাকশনে আর ইলাস্ট্রেশন দিতে পারেন নাই। একদিক থেকে দুঃখজনক। ইলাস্ট্রেশন দিতে পারলে এই প্রোডাকশনটা অন্য মাত্রায় যেত। গল্পের ভয়াবহতার সাথে ইলাস্ট্রেশন মিলেমিশে এক চরম মাত্রার পাঠ অভিজ্ঞতা হতে পারতো। আবার একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। হৃদয়বিদারক গল্পের সাথে লোমহর্ষক সব ইলাস্ট্রেশনের মাঝে পরে দুঃস্বপ্ন তারিত হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলাম।

প্রকাশকের প্রতিও সুভেচ্ছা। আরো চমৎকার সব বই, চমৎকার প্রোডাকশনে পাঠকের হাতে তুলে দিক।

বইয়ের ডিটেইলসঃ

বইঃ দি আউটসাইডার

জনরাঃ ক্রাইম ফিকশন, হরর

লেখকঃ স্টিফেন কিং

অনুবাদকঃ মো. ফুয়াদ আল ফিদাহ

প্রকাশকঃ পেন্ডুলাম পাবলিশার্স

প্রচ্ছদঃ জুলিয়ান

প্রকাশকালঃ নভেম্বর ২০২০

মুদ্রিত মূল্যঃ ৬০০ টাকা

পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৪৪৩ (অনুবাদকের কথা, উৎসর্গ, কোটেশন, লেখকের কথা, লেখক পরিচিতি এগুলো বাদ দিয়ে)

Categories
Book Review

বাঁধ ও ব্যারেজ সর্ম্পকিত কিছু সাধারণ তথ্য

জলবিদ্যুৎ বাঁধ

বাঁধ হলো নদীর প্রবাহের সাথে সমকোনে (আড়াআড়ি) স্থাপিত প্রতিবন্ধক এবং পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল স্থাপনা, যেমনটা কাপ্তাই বাঁধ। সাধারণত খরোস্রোতা নদীর প্রবাহকে বাঁধ দিয়ে আটকে এর উজানে জলাধার তৈরী করে পানির উচ্চতা বাড়ানো হয়। এরপর জলাধারের নিচে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে এই পানিকে প্রবাহিত করে টারবাইন ঘুড়িয়ে উৎপন্ন করা হয় বিদ্যুৎ। সুতরাং বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো বা কামানো মানে জলাধার থেকে পানি ছেড়ে দেয়ার পরিমান কম বেশি করা। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়লেও জলাধারে আটকে রাখার কারণে ভাটি অঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যাবে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পানি কম আসলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনে জলাধার থেকে নিয়মিত পানি ছাড়া হবে, ফলে বাঁধের ভাটিতে পানির প্রবাহ আগের থেকে বাড়বে।

ব্যারেজ

অন্যদিকে ব্যারেজ হলো নদীর পানিকে একাধিক গেইট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ভাবে প্রবাহিত করা। ব্যারেজের ঠিক উজানে এক বা একাধিক কৃত্রিম খাল খনন করে নিয়ন্ত্রিত ভাবে পানি প্রবাহিত করে আরো ছোট ছোট খাল দিয়ে (তিস্তা ব্যারেজ, বাংলাদেশ) বা পাম্পের মাধ্যমে (জিকে প্রকল্প, বাংলাদেশ) আবাদী জমিতে সেচ দেয়া হয় অথবা অন্য কোন নদীতে পানি প্রবাহ বাড়ানো হয় (যেমন ফাঁরাক্কা ব্যারেজ)। অর্থ্যাৎ ব্যারেজের মূল লক্ষ্যই থাকে একটি নদী থেকে পানি অপসারণ, অন্যদিকে বাঁধের মূল উদ্দেশ্য উজানে পানি সঞ্চয়। ভারতের টিপাইমুখ প্রকল্প শুধু বাঁধ নয়। টিপাইমুখ প্রকল্পের উদ্দেশ্যের মধ্যে এই বাঁধ থেকে ৯৫ কিমি ভাটিতে একটি ব্যারেজের (ফুলেরতাল) প্রস্তাবও রয়েছে।

উজান এবং ভাটি – দুই দিকেই বাধের প্রভাব পরে। উজানে কৃত্রিম জলাধারের কারণে এবং ভাটিতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রনের কারণে।

উজানে বাঁধের সাধারণ প্রভাব –

ক) কৃত্রিম জলাধারের কারণে বিপুল পরিমান এলাকা পানির নিচে নিমজ্জিত হয়, ফলে মানুষের ঘরবাড়ি আবাদী জমিসহ শুষ্ক/শুকনো এলাকা জলাভূমিতে পরিনত হয়। বনভূমি ও অন্যন্য উদ্ভিদ পানির নিচে তলিয়ে পচে গিয়ে বিপূল পরিমান কার্বন নিঃসরণ করে, ফলে বায়ুমন্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাস বাড়ায়।

খ) নদীর স্থানে জলাধার তৈরির ফলে পানির উপরিতলের ক্ষেত্রফল বাড়ে, যা স্বতঃবাষ্পীভবনের (ইভ্যাপরেশন) হার বাড়ায়। আগে নদী থেকে যে পরিমান পানি বাষ্প হতো, এখন অনেক বেশী পরিমান স্বতঃবাষ্পীভূত হয়। এটি প্রকারান্তরে নদীর পানির প্রবাহকে কমিয়ে দেয়। এর পরিমান নেহায়েত কম নয়। এক হিসেব মতে আমেরিকার ‘হোভার ড্যামে’র কারণে সৃষ্ট ‘লেক মেড’ থেকে বাৎসরিক ৩৫০ বিলিয়ন গ্যালন পানি কমে যায় এবং নদীর প্রবাহ কমিয়ে দেয়।

গ) বাঁধের সবচাইতে বড় প্রভাব হল বাস্তুসংস্থান বিপর্যয়। বাঁধের উজানে স্বাভাবিক ভাবেই একটি স্থলজ বাস্তুসংস্থান ছিল। সেটি সম্পূর্ণ ভাবে বিনষ্ট হয়ে একটি কৃত্রিম জলজ বাস্তুসংস্থান তৈরী হয়। এতে করে অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়। এছাড়াও বহু প্রজাতির মাছ বছরের একটি বিশেষ সময়ে ভাটি থেকে উজানে যায়। বাঁধের কারনে মাছের এই অভিভাসন সম্পূর্ণ রূপে বিনষ্ট হয়ে উৎপাদন কমে, বা নিঃশেষ হয়।

ঙ) শুধু পানিই না নদী প্রবাহ বয়ে নিয়ে চলে বিপূল পরিমান পলি। বাঁধের ফলে উজানে নদীর গতিবেগ অনেক কমে যায়, পানির পক্ষে এই পলি আর ধরে রাখা সম্ভব হয়না, তা ধীরে ধীরে নিচে পড়ে জলাধারের বুকে জমতে থাকে। এটি জলাধারের নিচের স্তরের উচ্চতা বাড়িয়ে দেয়।

ভাটিতে এর সাধারণ প্রভাব –

) পানিবিদ্যুৎ বাঁধের কারণে স্বভাবতই বর্ষা মৌসুমে প্রবাহ কমে, ফলে ভাটি অঞ্চলের স্বাভাবিক জলজ বাস্তুসংস্থান ব্যহত হয়। যেসকল জলজ প্রানীর প্রজননে বাৎসরিক বন্যা সম্পর্কযুক্ত, তাদের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যহত হয়। এছাড়াও স্বাভাবিক বন্যায় আশেপাশের স্থলাভূমি থেকে জলজ প্রানীর প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য নদীতে মেশে। সুতরাং স্বাভাবিক বন্যা ব্যহত হলে এই প্রক্রিয়া বাধগ্রস্থ হয় এবং ফলশ্রুতিতে এদের বিলুপ্তি ঘটে।

খ) গভীরতা অনুযায়ী পানির বেগ নদীতে ভিন্ন ভিন্ন হয়। সাধারণত নদীর তলদেশে বেগ কম থাকে আর উপরিতলের ঠিক আগে থাকে সর্বোচ্চ। উলম্ব তল বরাবর পানির বেগের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে নদীর বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ধরনের মাছ অভিযোজিত হয়। এই বেগের পরির্বতন মাছের স্বাভাবিক অভিযোজন বিনষ্ট ও জীবনচক্র ধ্বংস করে। ধ্বংসে হয় ভাটির মৎস সম্পদ।

) ‘নিন্মাঞ্চল’ সমতল ভূমির বৈশিষ্ট। প্রাকৃতিক নিয়মে বর্ষায় নদীর পানি উপচে এইসব নিন্মাঞ্চলগুলো পূর্ন হয়ে সারা বছর জলজ প্রানীর অভয়াশ্রমে পরিনত হয়; উদাহরণ স্বরূপ বাংলাদেশের হাওড়গুলি। এই নিন্মাঞ্চগুলোই আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি মজুদের কাজ করে, যা থেকে ছোটছোট নদী-খালগুলি ‘বেইজ ফ্লো’ হিসেবে পানির যোগান পায়। এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে নিন্মাঞ্চগুলি সঠিক সময়ে পানি না পাওয়াতে এদের স্বাভাবিক ‘মরফোলজি’ ব্যহত হবে আর সেই সাথে এর উপর নির্ভরশীল ছোট ছোট নদী-খালগুলো শুকিয়ে যাবে।

গ) বাঁধের ফলে নদীর সমস্ত পলি উজানের জলাধারের নিচে সঞ্চিত হওয়ার কারণে, টারবাইনের মধ্যে দিয়ে পানির যে প্রবাহ ভাটিতে পরিবাহিত হয় তা সম্পূর্নরূপে পলিমূক্ত থাকে আর তাই এর পলি ধারন ক্ষমতাও হয় সর্বোচ্চ। ফলে তা ভাটিতে প্রবাহিত হবার সময় নদীর বুক আর পাড় থেকে মাটি নিয়ে যায় আর তাই নদী ক্ষয়ের পরিমান হঠাৎ করে বিপূলাংশে বেড়ে যায়।

সহায়ক গ্রন্থসমূহঃ

০১. বাংলা দেশের নদ নদী ও পরিকল্পনা; কপিল ভট্টাচার্য। প্রথম সংহতি সংস্করণ, জানুয়ারী ২০০৮। সংহতি প্রকাশন।

০২. টিপাইমুখ বাঁধ ও বাংলাদেশ প্রক্ষাপট; জাহিদুল ইসলাম। ২০০৯। প্রকাশায়তন।